"হাওড়ার কুয়াশা থেকে হিমালয়ের আশায় – বৈষ্ণো দেবীর পথে আমার যাত্রা"
"হাওড়ার কুয়াশা থেকে হিমালয়ের আশায় – বৈষ্ণো দেবীর পথে আমার যাত্রা"
কলকাতার এক প্রার্থনার দিন
শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল ছিল সেটা। চারপাশে কেবল ধোঁয়া, চায়ের গন্ধ আর পাড়ার মন্দির থেকে ভেসে আসা শঙ্খধ্বনি। আমি বেহালার ছোট ঘরে বসে মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মা চলে যাওয়ার পর দু’টা বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মনে হয় যেন একটা শূন্যতা আজও বুকের মধ্যে গেঁথে আছে।
এক রাতে, স্বপ্নে দেখলাম মা একটা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে, হাত বাড়িয়ে আছে। আমি জানতাম না ওটা কোথায়, কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই বুঝে গেলাম—
বৈষ্ণো দেবী।
মা সবসময় যেতে চেয়েছিল।
এবার সেই পথে হাঁটার দায়িত্বটা আমার।
অধ্যায় ২: টিকিট আর চা – যাত্রার সূচনা
যাতায়াতের বিস্তারিত:
ট্রেন: আমি কলকাতা এক্সপ্রেস (ট্রেন নং ১৩১৫১)-এ হাওড়া থেকে জম্মু তাওয়ী রুটে স্লিপার ক্লাসে টিকিট কাটি। ভাড়া: ₹৬৩৫।
মোট সময়: প্রায় ৩৬ ঘণ্টা।
একটা ব্যাগ, একটা জলের বোতল আর মায়ের পুরনো শাল নিয়ে রওনা হলাম। জানালার ধারে বসে ছিলাম, এক বৃদ্ধ দম্পতি স্থান করে দিলেন। বাইরের দৃশ্য আর মনের অভ্যন্তরের অনুভূতি যেন একে অপরের প্রতিফলন হয়ে উঠছিল।
জম্মু – দেবীর প্রথম দিগন্ত
দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় জম্মু তাওয়ী পৌঁছালাম। ঠাণ্ডা কেমন যেন একটা শান্তি নিয়ে এল।
রাতটা কাটালাম হোটেল স্বস্তিকে, জম্মু স্টেশন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে।
হোটেল স্বস্তিক (জম্মু):
রুম: ₹৬০০ (নন-এসি সিঙ্গেল)
গরম জল আর পরিষ্কার বিছানা — যথেষ্ট।
বাইরের চায়ের দোকান থেকে এক কাপ গরম চা — সেই মুহূর্তে যেন স্বর্গীয় |
পরদিন সকালে শেয়ার্ড ট্যাক্সিতে জম্মু থেকে কাটরা (₹১২০) রওনা দিলাম। পাহাড়ের পথ যেন এক একটি গল্পের ধারা। কেউ সন্তান কামনায়, কেউ শেষ ইচ্ছা পূরণে যাচ্ছেন।
কাটরা পৌঁছে উঠলাম হোটেল ভবানী প্যারাডাইসে।
হোটেল ভবানী প্যারাডাইস (কাটরা):
রুম: ₹৭০০/রাত (বাজেট রুম)
সাধারন থালি: ₹১০০ (ডাল, ভাত, তরকারি, রুটি)
রাতে, তারা ভরা আকাশের নিচে ১৩ কিমি হেঁটে চললাম বৈষ্ণো দেবীর মন্দিরের দিকে। কেউ হাঁটছে খালি পায়ে, কেউ ভজন গাইছে, কেউ নিঃশব্দে কাঁদছে। আমি কেবল হাঁটছি—মায়ের শালটা জড়িয়ে।
পথে:
লঙ্গর থেকে বিনামূল্যে খাবার—খিচুড়ি আর চা
ঘোড়া ও ডান্ডি চলেছে পেছনে-পিছনে, আমি হেঁটেই চলেছি
অর্ধকুমারী গুহায় একটু বিশ্রাম। ছবি রেখে বললাম, “মা, আমরা আসছি।”
এক সময় ভৈরবনাথ এর পথে হালকা তুষারপাত শুরু হলো। প্রথমবার বরফ দেখলাম—ঠাণ্ডা, কিন্তু যেন আশীর্বাদের মতো কোমল।
দর্শন ও শুদ্ধি
রাত সাড়ে তিনটা। ক্লান্ত শরীর, ভেজা চোখ, কিন্তু হৃদয়ভরা প্রত্যাশা নিয়ে প্রবেশ করলাম বৈষ্ণো দেবীর গুহায়।
দেবীর দর্শন করে চোখ ভিজে উঠল। যেন মা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মায়ের ছবি রেখে ফিসফিস করে বললাম, “আমরা পেরেছি।”
ভেতরের শূন্যতা তখনো ছিল, কিন্তু এখন সেটা একটা শান্ত আলোয় ভরা।
ফিরে দেখা – আশীর্বাদ নিয়ে ঘরে ফেরা
ভৈরবনাথের দর্শন শেষে নিচে নেমে এলাম। কাটরায় আবার এক রাত কাটিয়ে পরদিন বাসে জম্মু ফিরে (₹১০০) এলাম এবং ফেরার ট্রেনে উঠলাম।
সম্পূর্ণ বাজেট (একজন ব্যক্তির জন্য):
খরচ পরিমাণ
ট্রেন (স্লিপার, রাউন্ড ট্রিপ) ₹১,২৭০
জম্মু হোটেল (১ রাত) ₹৬০০
ট্যাক্সি: জম্মু → কাটরা ₹১২০
কাটরা হোটেল (২ রাত) ₹১,৪০০
খাবার ও অন্যান্য ₹৮০০
মোট ₹৪,১৯০
বৈষ্ণো দেবী শুধু এক যাত্রা নয়।
ওটা ছিল মনকে জোড়া লাগানোর এক মুহূর্ত।
ওটা ছিল নিরব প্রার্থনার উত্তর।
ওটা ছিল এক মায়ের আশীর্বাদ—চিরন্তন, ঠিক যেমন তাঁর ভালোবাসা।


Comments
Post a Comment